প্রাচীন অনুবর্তন তত্ত্বটি পরীক্ষাটি সহ ব্যাখ্যা করো ?

প্যাভলভের প্রাচীন অনুবর্তনের পরীক্ষাটি ব্যাখ্যা করো _ (1)
প্রাচীন অনুবর্তনের সাংগঠনিক রূপ_

প্যাভলভের প্রাচীন অনুবর্তন তত্ত্ব বা কৌশল:

১৯০৪ সালে রাশিয়ান শারীরতত্ত্ববিদ আইভ্যান পেত্রভিচ প্যাভলভ (Ivan petrovich pavlov) সর্ব প্রথম প্রাচীন অনুবর্তন তত্ত্বটি উল্লেখ করেন। তিনি বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রমান করেন যে, একটি স্বাভাবিক উদ্দীপকের সঙ্গে যদি একটি বিকল্প উদ্দীপক যুক্ত । তারপর সেটি বার বার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে স্বাভাবিক উদ্দীপকটি যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে বিকল্প উদ্দীপকটিও সেই একই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।

প্যাভলভের প্রাচীন অনুবর্তন এর পরীক্ষা:

 

প্যাভলভ তাঁর অনুবর্তন তত্ত্বটি প্রকাশ করার আগে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ক্ষুধার্ত কুকুরের লালা নিঃসরণের পরীক্ষা

উপকরণ: প্যাভলভ তাঁর পরীক্ষার জন্য প্রাণী হিসাবে  একটি ক্ষুধার্ত কুকুর  এবং বস্তু হিসাবে একটি ঘন্টা, কিছু খাদ্যবস্তু, আর  কিছু প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার করেন।

পরীক্ষা:   প্যাভলভ ক্ষুধার্ত কুকুরটির সামনে খাদ্যবস্তু রেখে দেখেন কুকুরটির লালাক্ষরণ হয় । এক্ষেত্রে  খাদ্যবস্তুটির(উদ্দীপক) স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হল  লালানিঃসরণ  । আবার ঘণ্টাধ্বনি বাজিয়ে দেখেন কুকুরটি সজাগ হয়। এখানেও ঘণ্টাধ্বনির (উদ্দীপক) স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হল সজাগভাব।

পরীক্ষামূলক পরিস্থিতি:

প্রথম: প্যাভলভ পরীক্ষামূলক পরিস্থিতিতে কুকুরটিকে খাদ্যবস্তু দেওয়ার ঠিক আগে কিছুক্ষণ ঘণ্টা বাজাতে থাকেন যাতে কুকুরটি সজাগ হয় ।

দ্বিতীয়: প্যাভলভ ঘণ্টা ধ্বনি চলাকালীন শব্দ শেষ না হওয়ার আগেই  কুকুরটির সামনে খাদ্যবস্তু  দিলেন। তারপর তিনি লক্ষ্য করলেন,  কুকুরটির খাদ্যবস্তু দেখার সঙ্গে সঙ্গে লালনিঃসরণ হচ্ছে।

তৃতীয়: এইভাবে তিনি কিছু দিন ঘণ্টা বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে শব্দ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কুকুরের সামনে খাদ্যবস্তু দিতে থাকেন।

চতুর্থ: তিনি এই পরীক্ষা কয়েকদিন পুনরাবৃত্তি করার পর পর্যবেক্ষণ করলেন  খাদ্যবস্তু দেওয়ার আগে ঘণ্টা বাজালেই কুকুরের লালানিঃসরণ হয়।

সিদ্ধান্ত: প্যাভলভ তাঁর পরীক্ষা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসেন যে লালা নিঃসরণ স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার স্বাভাবিক উদ্দীপক খাদ্যবস্তুটি বিকল্প বা গৌণ উদ্দীপক ঘণ্টা ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে ঘণ্টা ধ্বনি লালা নিঃসরণ ঘটাতে সাহায্য করে । একেই প্যাভলভ অনুবর্তিত – আবর্ত প্রতিক্রিয়া বা অনুবর্তিত প্রতিক্রিয়া বলেন।

 

প্রাচীন অনুবর্তনের সাংগঠনিক রূপ:

 

"<yoastmark

প্রাচীন অনুবর্তনের বৈশিষ্ট্য:

প্যাভলভের পরীক্ষাটি বিশ্লেষণ করলে কতগুলি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়-

১. সময়: প্রাচীন অনুবর্তন তত্ত্বে সময় হল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উদ্দীপক এবং প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সময়ের ব্যবধান হলে অনুবর্তন হবে না। যেমন- ঘণ্টা ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যবস্তু না দিলে কুকুরের লালা নিঃসরণ হত না।

২. বিকল্প বা গৌণ উদ্দীপকের উপস্থাপন: যে উদ্দীপকের (ঘণ্টা ধ্বনির) অনুবর্তন ঘটানো হবে সেটি স্বাভাবিক উদ্দিপকের  ঠিক আগে উপস্থাপন করতে হবে। যেমন – কুকুরকে খাদ্যবস্তু দেওয়ার আগে ঘণ্টা ধ্বনি  দেওয়া হয় ।

৩. স্বাভাবিক উদ্দীপক শক্তিশালী: স্বাভাবিক উদ্দীপকটি বিকল্প উদ্দীপকের থেকে বেশি শক্তিশালী। যেমন- লালা নিঃসরণ প্রতিক্রিয়াটির স্বাভাবিক উদ্দীপক খাদ্যবস্তু বিকল্প উদ্দীপকের থেকে বেশি শক্তিশালী ।

৪.পুনরাবৃত্তি: উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সংযোগ না হওয়া পর্যন্ত দুটি উদ্দীপকেরই বার বার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে হবে। যেমন- ঘণ্টা ধ্বনির শেষ না হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যবস্তু দিতে হবে। এটি চালিয়ে যেতে হবে।

৫. আপানুবর্তন: অনুবর্তন ঘটার পর যদি দীর্ঘ দিন ধরে ঘণ্টা বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যবস্তু দেওয়া না হয়, তাহলে কুকুরের লালা নিঃসরণ কমতে কমতে এক সময় বন্ধ হয়ে যাবে । এই লালা নিঃসরণ কমে যাওয়াকেই আপানুবর্তন বলে ।

৬. পুনসংযোজন: অনুবর্তন প্রক্রিয়াটিকে সক্রিয় রাখার জন্য ঘণ্টা ধ্বনির সাথে মাঝে মাঝে খাদ্যবস্তু দিতে হবে । মাঝে মাঝে খাদ্যবস্তু দেওয়াকেই পুনসংযোজন বলে।

সুতরাং  উপরের আলচনা থেকে বলা  যায় প্রাচীন অনুবর্তন তত্ত্বটির উপর ভিত্তি করে শিখন সংঘটিত হয়।

 

শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রাচীন অনুবর্তনের বা প্যাভলভের তত্ত্বের গুরুত্ব/ ভুমিকা  আলোচনা করো:

যে কোন প্রাণী থেকে শুরু করে মানব শিশুর শিখনে প্যাভলভের প্রাচীন অনুবর্তনের   গুরুত্ব লক্ষ্য করা যায় । শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাচীন অনুবর্তনের গুরুত্ব গুলি হল-

১. শিশুর ভাষার বিকাশ: বার বার অনুশীলনের মাধ্যমে শিশুর কোনো ভাষা এবং যেকোনো শব্দ শিখতে সহজ হয়।

২. সুঅভ্যাস গঠন: এই কৌশল শিশুর মধ্যে সু অভ্যাস গঠনে  সাহায্য করে। যেমন-পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা,ঠিক সময়ে পড়তে বসা, স্নান করা ইত্যাদি।

৩. কু অভ্যাস দূর করা: এই অনুবর্তনের সাহায্যে শিক্ষার্থীর কু অভ্যাস দূর করা যায়। যেমন- ভুল বানান ঠিক করা, ভুল উচ্চারণ শুদ্ধ করা ইত্যাদি।

৪. প্রাক্ষোভির বিকাশ : এই কৌশলের সাহায্যে শিশুর  প্রাক্ষোভিক বিকাশ ঘটানো যায়। বিশেষ করে শিশুর শিক্ষায় অহেতুক ভয় দূর করে শিক্ষামূলক অগ্রগতিতে সাহায্য করে।

৫. আগ্রহ: প্রাচীন অনুবর্তনের সাহায্যে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে বিভিন্ন পাঠ্যবিষয়য়ে অনিচ্ছা দূর করে আগ্রহ সৃষ্টি করা যায় ।

সুতরাং বলা যায় প্রাচীন অনুবর্তন কৌশল কেবল শিক্ষার্থীর উপর প্রভাব বিস্তার করে তা নয়। শিক্ষক-শিখিকাদের আচরণের উপরও প্রভাব বিস্তার করে।