প্রেষণা কাকে বলে ? শিক্ষায় প্রেষণার গুরুত্ব আলোচনা করো ?

প্রেষণা কাকে বলে ? শিক্ষায় প্রেষণার গুরুত্ব আলোচনা করো ?

প্রেষণা কাকে বলে ? শিক্ষায় প্রেষণার গুরুত্ব আলোচনা করো ?

প্রেষণা কাকে বলে ? প্রেষণা শব্দটির ইংরেজি শব্দ ’’ Motivation এই শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ “ Moveers” থেকে ।যার অর্থ হল চলা  বা ‘Move’। অর্থাৎ মনের অভ্যন্তরীণ যে শক্তি  আমাদের চালনা করে তাই হল প্রেষণা বা প্রেরণা  ।

সংজ্ঞাঃ  প্রেষণার সংজ্ঞা বিভিন্ন মনোবিদ বিভিন্ন ভাবে দিয়েছেন । যেমন,

মনোবিদ সুইফট (Swift) এর মতে, “ ব্যক্তির নানান ধরনের চাহিদা পরিতৃপ্তির জন্য যে পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া তার আচারনধারাকে  সবসময় নিয়ন্ত্রণ করে তাই হল প্রেষণা । ‘’

মনোবিদ ক্রাইডা(Cryder) বলেন, ‘’ যে আগ্রহ , আকাঙ্ক্ষা এবং প্রয়োজন একটি প্রাণীকে সক্রিয় করে তোলে এবং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে পরিচালিত করে তাকে প্রেষণা বলা যায়।“

সুতরাং সংজ্ঞা গুলি থেকে বলা যায়, প্রেষণা হল এমন একটি মানসিক প্রক্রিয়া যা কোনো অভাববোধ দূর করার উদ্দেশ্যে তাড়নার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আমদের লক্ষ্য পূরণে কর্মশক্তির সঞ্চার করে।

প্রেষণা চক্রঃ

প্রেষণা  হল শিখনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যা আমদের যেকোনো কাজে অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করে । প্রেষণা কে বিশ্লেষণ করলে চারটি পর্যায় পাওয়া যায় । ১. চাহিদা বা অভাববোধ, ২. তাড়না, ৩. সহায়ক বা উদ্দেশ্যমুখী আচরণ, ৪. লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যপূরণ ।

প্রেষণা চক্র

১. চাহিদা বা অভাববোধঃ  প্রেষণার চক্রের প্রথম পর্যায় হল  চাহিদা বা অভাববোধ। বিভিন্ন কারনে ব্যক্তির মধ্যে চাহিদা বা অভাববোধ সৃষ্টি হতে পারে । যেমন, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, স্বীকৃতি, অভ্যন্তরীণ স্পৃহা, সন্মান, স্বাধীনতা, মাতৃত্ব ইত্যদি।

২. তাড়নাঃ এটি প্রেষণার চক্রের দ্বিতীয় পর্যায়। চাহিদা বা অভাববোধ থেকে ব্যক্তির মধ্যে একধরনের অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয় একেই তাড়না বলে। এই অস্বস্তিকর অবস্থা ব্যক্তিকে  অভাববোধ পূরণের জন্য তাড়িত করে তোলে।

৩. সহায়ক বা উদ্দেশ্যমুখী আচরণঃ প্রেষণার চক্রের তৃতীয় পর্যায় হল সহায়ক বা যান্ত্রিক আচরণ। ব্যক্তি অস্বস্তিকর অবস্থা দূর করার জন্য কতগুলি উদ্দেশ্যমুখী যান্ত্রিক আচরণ করে। একেই সহায়ক আচরণ বলে।

৪. লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যপূরণঃ প্রেষণার চক্রের শেষ পর্যায় হল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যপূরণ। লক্ষ্যে পোঁছাতে পারলে ব্যক্তির অস্বস্তিকর শারীরিক অবস্থা দূর হয় এবং সে পরিতৃপ্তি লাভ করে।

 প্রেষণার বৈশিষ্ট্যঃ

প্রেষণার বৈশিষ্ট্য গুলি হল –

১ চাহিদা নিরভরঃ প্রেষণা সৃষ্টি হয় ব্যক্তির বিশেষ চাহিদাকে কেন্দ্র করে। এই চাহদা বা অভাববোধ হল প্রেষণার সৃষ্টির মূল উৎস।

২. তাড়নাঃ ব্যক্তির চাহিদা সরাসরি উদ্দেশ্যমুখী আচরণ সৃষ্টি করতে পারে না। তার অভাববোধ এক ধরনের মানসিক অবস্থা সৃষ্টি করে । অর্থাৎ ব্যক্তির মধ্যে তাড়না সৃষ্টি হয় । এই তাড়নাই ব্যক্তিকে উদ্দেশ্যমুখী আচরণ করতে সক্রিয় করে তোলে।

৩.  লক্ষ্যবস্তু নিরধারণঃ ব্যক্তি উদ্দেশ্যমুখী আচরণের মাধ্যমেই তার লক্ষ্যবস্তুকে পেতে চায়। লক্ষ্যবস্তু  অর্জনের মাধ্যমেই তার চাহিদার পরিতৃপ্তি ঘটে ।ফলে, কর্মতৎপরতা হ্রাস পায় ।

৪. প্রেষণার হ্রাস- বৃদ্ধিঃ ব্যক্তির মধ্যে চাহিদা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে উদ্দেশ্যমুখী আচরণের শুরু হয় এবং চাহিদার তৃপ্তি ঘটে । ফলে, প্রেষণা হ্রাস পায়। আবার নতুন করে ব্যক্তির মধ্যে প্রেষণার সৃষ্টি হয়। এই ভাবে প্রেষণার হ্রাস- বৃদ্ধি ঘটতে থাকে।

৫. কর্মতৎপরতা বৃদ্ধিঃ প্রেষণা ব্যক্তির মধ্যে কখনো বাড়িয়ে তোলে আবার কমিয়ে আনে , যা ব্যক্তির চাহিদার প্রকৃতি ও লক্ষ্যবস্তু দ্বারা ঠিক হয়। ব্যক্তির চাহিদার অতৃপ্তির জন্য ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়। পরে তা প্রেষণার মাধ্যমে দূর করা যায়।

সুতরাং বলা যায়-

  • প্রেরণা কোনো কার্য সম্পাদ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করে ।
  • এটি কাজকে লক্ষ্যের অভিমুখ করে তলে ।
  • প্রেষণা চিরস্থায়ী নয়।
  • প্রেষণার তীব্রতার তারতম্য হতে পারে।
  • এটি মুলত নির্বাচন মূলক ।

শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রেষণার ভূমিকা বা গুরুত্বঃ

শিক্ষার্থীর শিখনের ক্ষেত্রে প্রেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিখন যেহেতু উদ্দেশ্যমুখী আচরণ সম্পাদনের প্রক্রিয়া, তাই প্রেষণার প্রয়োজন হয়। শিখনে প্রেষণার ভূমিকা হল-

১. উদ্যম সৃষ্টিঃ ব্যক্তির যেকোনো কাজের জন্য  সবার আগে প্রয়োজন উদ্যম। প্রেষণাই এই উদ্যম সৃষ্টি করে। অর্থাৎ প্রেষণাই শিক্ষার্থীর অভ্যন্তরীণ শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। ফলে সে যেকোনো কাজে উৎসাহিত হয়।

২. লক্ষ্য আভিমুখীঃ প্রেরণা শিক্ষার্থীকে শিক্ষার লখ্যাভিমুখী করে তোলে। শিক্ষার্থীর একটি লক্ষ্য পুরুন হলে সে পরবর্তী লক্ষ্য পূরণের জন্য আর বেশি উদ্যোগী হয়ে ওঠে।

৩. আগ্রহঃ প্রেরণা শিক্ষার্থীর মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীর বিশেষ বিষয়ের প্রতি প্রেষণা তার আগ্রহের দ্বারা ঠিক হয়। আগ্রহ অনুযায়ী বিষয়বস্তু নির্ধারণ হলে শিক্ষার্থীর মধ্যে সফলতা আসে।

৪. মনোযোগঃ প্রেরণা শিক্ষার্থীকে মনোযোগী করে তোলে। মনোযোগ শিক্ষার্থীর বিষয় জ্ঞানকে আরও নির্ভুল ও পরিষ্কার করে।

৫. প্রশংসাঃ শিক্ষার্থীদের কাজের মাঝে মাঝে প্রশংসা করতে হবে। প্রশংসা করলে শিক্ষার্থী কাজে উৎসাহিত হয়। ফলে, তাদের মধ্যে শিখনের প্রতি আগ্রহ জাগে।

৬. অভ্যাস গঠনঃ প্রেরণা শিক্ষার্থীর মধ্যে সুঅভ্যাস গঠন করে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর মধ্যে পড়ার অভ্যাস তৈরি করে যা তার বিষয়জ্ঞান বৃদ্ধি পায়।

৭.সৃজন ক্ষমতার বিকাশঃ প্রেষণা  যেহেতু একটি অভ্যন্তরীণ মানসিক প্রক্রিয়া, তাই শিক্ষার্থীর সৃজনশীল ক্ষমতার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করে।

৮. কর্মসম্পাদনঃ শিখন চলাকালীন শিক্ষার্থীর যে সকল কাজ থাকে তা সঠিকভাবে করতে প্রেরণা সাহায্য করে।

সুতরাং উপরের আলোচনা থেকে বলা যায়, যে কোনো শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে প্রেষণার উপর। এটি যেহেতু একটি মানসিক অবস্থা, যা শিক্ষার্থীর শিক্ষামূলক কাজগুলি যথাযথ ভাবে করতে সাহায্য করে। তাই, শিক্ষার্থীর প্রেষণা সৃষ্টিতে শিক্ষক- শিক্ষিকা এবং পিতামাতার ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।