মনোযোগ কাকে বলে ? শিক্ষাক্ষেত্রে মনোযোগের গুরুত্ব আলোচনা করো ?

মনোযোগ কাকে বলে ? শিক্ষাক্ষেত্রে মনোযোগের গুরুত্ব আলোচনা করো ?
মনোযোগ কাকে বলে ? শিক্ষাক্ষেত্রে মনোযোগের গুরুত্ব আলোচনা করো ?

মনোযোগ কাকে বলে ? মনোযোগের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো ? শিক্ষাক্ষেত্রে মনোযোগের গুরুত্ব আলোচনা করো ?

মনোযোগ  কাকে বলে ? সাধারণভাবে মনোযোগ ( Attention) শব্দের অর্থ হল মনকে একান্ত ভাবে যুক্ত করা। অর্থাৎ মনোযোগ হল একটি মানসিক প্রক্রিয়া, যার সাহায্যে মনকে আমরা কোনো  বস্তু বা ঘটনার সঙ্গে নিবেশ করতে পারি ।

মনোযোগের সংজ্ঞা:

বিভিন্ন মনোবিদ মনোযোগের বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-

মনোবিদ ম্যাকডুগালের মতে, “ যে মানসিক সক্রিয়তা আমাদের প্রত্যক্ষণের উপর প্রভাব বিস্তার করে তাকে মনোযোগ বলে ।“

মনোবিদ রস এর মতে, “ মনোযোগ একটি প্রক্রিয়া যা চিন্তার বিষয়কে সুস্পষ্টভাবে মনের দরজায় এনে উপস্থিত করে।“

ফ্লেচারের মতে, “ মনোযোগ হল এমন একটি প্রক্রিয়া যা ইন্দ্রিয়কে উদ্দীপিত করে পরিবেশের পর্যবেক্ষিত বিষয়গুলি থেকে কিছু বিষয়কে গ্রহন এবং বাকি গুলিকে বর্জন করে।“

সুতরাং উপরের  সংজ্ঞা গুলির পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, যে প্রক্রিয়া অনেকগুলি বিষয়ের মধ্য থেকে কোনো একটি বিশেষ বিষয়ের প্রতি চেতন মনকে কেন্দ্রভূত করে। সেই বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের ধারণা স্পষ্ট করে তাকে মনোযোগ বলে।

মনোযোগের বৈশিষ্ট্য:

মনোযোগ সম্পর্কে ধারণা গঠন করতে হলে তার বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করা দরকার। নিচে আলোচনা করা হল-

মনোযোগের বৈশিষ্ট্য

 

১. নির্বাচনধর্মী: একই সঙ্গে অনেকগুলি উদ্দীপক আমাদের চেতনার কেন্দ্রকে দখল করে।  সেই একাধিক উদ্দীপকের মধ্যে মনোযোগ একটিকে নির্বাচন করে ।

২. বিদোলনধর্মী বা পরিবর্তনশীলতা: মনোযোগের একটি ধর্ম হল পরিবর্তনশীলতা । কারণ একটি বিষয়ের উপর মনোযোগ বেশি সময় রাখা যায় না, তা অন্য বিষয়ে চলে যায়। একেই মনোযোগের বিদোলন  বলে ।

৩.  বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণধর্মী: কোনো বস্তু যখন আমাদের চেতন মনের কেন্দ্রে উপস্থিত হয়, তখন ওই বস্তু সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা ফুটে ওঠে । বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই বিশ্লেষণধর্মী জ্ঞান সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বস্তু সম্পর্কে একটি সামগ্রিক অভিজ্ঞতা অর্জন হয়। যেমন, একটি ফুলের প্রতি মনোযোগ দিতে গিয়ে তার রং , আকার, গন্ধ বিভিন্ন অংশের দিকে মনোযোগ দিয়ে থাকি।

৪.  বিচলনধর্মী বা চঞ্চলতা: মনোযোগের গভীরতা সর্বদা একই থাকে না, কখনো বাড়ে এবং কখনো কমে। এটি মনোযোগের বিচলন ধর্মের জন্য হয়। যেমন, ঘড়ির আওয়াজে মনোযোগ দিলে শব্দ শোনা যায় । মনোযোগ না দিলে শব্দ শোনা যায় না।

৫.  মনোযোগের পরিসর বা বিস্তার: দেখে বা শুনে ব্যক্তি কোনো বস্তুর প্রতি যত খুশি মনোযোগ দিতে পারে। তার কারণ চেতনার স্তরে কয়েকটি বস্তুকে কেবল কেন্দ্রস্থলে উপস্থিত করা যেতে পারে। একেই মনোযোগের পরিসর বলা হয়। ট্যাচিসটোস্কোপ ( Tachistoscope) যন্ত্রের সাহায্যে মনোযোগের পরিসর পরিমাপ করা হয়।

সুতরাং উপরের বৈশিষ্ট্যগুলি ভিত্তিতে মনোযোগের একটি কার্যকরী সংজ্ঞা দেওয়া যায়- মনোযোগ এমন এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিবর্তনশীল সদা চঞ্চল সচেতন মানসিক ক্রিয়া যা নির্বাচিত বিষয়বস্তুর সংশ্লেষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে একক বস্তুধর্মী জ্ঞান আহরণে ব্যক্তিকে সহায়তা করে।

শিক্ষাক্ষেত্রে মনোযোগের গুরুত্ব :

 মনোযোগ হল শিখনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদান । তাই সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি হল মনোযোগ। শিক্ষার্থীর মনঃসংযোগ যাতে ব্যহত না হয় সেব্যাপারে শিক্ষকদের সচেতন থাকতে হবে। শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা বৃদ্ধিতে মনোযোগের গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষাক্ষেত্রে মনোযোগের ভূমিকা হল-

শিক্ষাক্ষেত্রে মনোযোগের গুরুত্ব

১. বিষয়বস্তুর স্পষ্টতা: মনোযোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর বিষয়বস্তুর স্পষ্ট জ্ঞান বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। কারণ, শিক্ষার্থী মনোযোগ সহকারে কোনো বিষয় পড়লে সেই বিষয় সম্পর্কে তার পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়।

২. পারদর্শিতা বৃদ্ধি: শিক্ষার্থী যে বিষয় মনোযোগ সহকারে আয়ত্ব করে, সেই বিষয় সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়। ফলে, তার পারদর্শিতার মাত্রা বৃদ্ধি পায় ।

৩. বস্তুকেন্দ্রিক সেন্টিমেন্ট: মনোযোগ ব্যক্তির মধ্যে বস্তুকেন্দ্রিক সেন্টিমেন্ট গড়ে তোলে, যা শিক্ষার্থীর জীবনব্যাপী শিখনে সহায়তা করে।

৪. উন্নত বিদ্যালয় পরিবেশ: শিখন প্রক্রিয়াকে ফল্প্রসু করতে হলে উন্নত বিদ্যালয় পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। যাতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগ্রহণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়।

৫. দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি: যে বিষয়ে যত বেশি মনোযোগ দেওয়া যায় সেই বিষয় তত বেশি মনে থাকে। তাই শিক্ষার্থীরা যদি পাঠ গ্রহণের সময় সক্রিয়ভাবে মনোযোগ দেয় তার স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী হয়।

৬. সৃজন ক্ষমতার বিকাশ: মনোযোগ শিক্ষার্থীকে সৃজনশীল করে তোলে। মনোযোগ দেওয়ার ফলে শিক্ষার্থী নতুন নতুন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে।এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সৃজনশীল ক্ষমতার বিকাশ ঘটে।

সুতরাং বলা যায় মনোযোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক সক্রিয়তা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তাই শিক্ষাদানের সময় শিক্ষকগণ বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে  সেই সব কৌশল প্রয়োগ করবেন যা শিক্ষার্থীকে পড়ায় মনোযোগী করে তুলবে।